রিজিক বৃদ্ধির ইসলামিক আমল
সবাই চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক, জীবনে প্রাচুর্য আসুক। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে রিজিক বৃদ্ধির ১৩ টি আমল বর্ণনা করা হয়েছে। সেগুলো হলো—
সুরা নুহ-এ আল্লাহ তাআলা তার অনুগত বান্দাদের রিজিকে বরকত লাভের জন্য সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং প্রবাহিত করবেন নদীনালা।’ (সুরা নুহ : আয়াত ১০-১২)
কুরআনের দিক নির্দেশনার আলোকে বুঝা যায়, রিজিকে বরকত লাভের কুরআনি আমিল হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। যারা নিয়মিত বেশি বেশি ইসতেগফার পড়বে তাদের জন্য রিজিকের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
১.তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা
খোদাভীতি ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন রিজিক বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তার উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)
২. পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা
আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করলে ইহকালেই সুফল পাওয়া যায়। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কামনা করে যে তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৫; মুসলিম, হাদিস : ৪৬৩৯)
৩. তওবা ও ইস্তিগফার করা
মুমিনের জীবনে তওবা ও ইস্তিগফারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া রিজিক বৃদ্ধির কারণ। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৭৬৭৭)
৪. আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা
দানে ধন বাড়ে—এটা সর্বজনবিদিত। এ বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য এমন—বলে দাও, ‘নিশ্চয়ই আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৯)
৫. বারবার হজ-ওমরাহ করা
একের পর এক হজ-ওমরাহ পালনে রিজিক বাড়ে। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা একের পর এক হজ ও ওমরাহ করতে থাকো, কেননা তা অভাব ও গুনাহ দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে দেয়। (তিরমিজি, হাদিস : ৮১৫)
৬. অসহায়ের প্রতি সদয় আচরণ
বিপদ-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সামাজিক ইবাদত। মোসআব বিন সাদ (রা.) যুদ্ধজয়ের পর মনে মনে কল্পনা করলেন, তিনি বোধ হয় তাঁর বীরত্ব ও শৌর্যবীর্যের কারণে অন্যের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। এমন প্রেক্ষাপটে মহানবী (সা.) তাকে বলেন, তোমাদের মধ্যে থাকা দুর্বলদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক প্রদান করা হয়। (বুখারি, হাদিস : ২৮৯৬)
৭. ইবাদতের জন্য নিজেকে ফারেগ করে নেওয়া
আল্লাহর ইবাদতের জন্য নিজেকে ফারেগ করার মাধ্যমে অভাব দূর হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদম সন্তান, আমার ইবাদতের জন্য তুমি ঝামেলামুক্ত হও, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র্য ঘুচিয়ে দেব। আর যদি তা না করো, তবে তোমার হাত ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৫৪)
৮. আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করা
আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হিজরত তথা স্বদেশ ত্যাগ করলে এর মাধ্যমেও রিজিকে প্রশস্ততা ঘটে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করবে, সে জমিনে বহু আশ্রয়ের জায়গা ও সচ্ছলতা পাবে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশে মুহাজির হয়ে নিজ ঘর থেকে বের হয় তারপর তাকে মৃত্যু পেয়ে বসে, তাহলে তার প্রতিদান আল্লাহর ওপর অবধারিত হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১০০)
৯. বিয়ে করা
বিয়ের মাধ্যমে জীবনে বরকত ও প্রাচুর্য নেমে আসে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিয়ে দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করা দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’ (সুরা : নূর, আয়াত : ৩২)
১০. অভাব থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা
আল্লাহর কাছে চাইলে আল্লাহ বান্দার হাত ফিরিয়ে দেন না। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)
১১।সর্বদা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা
আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে অবস্থাতেই রাখুক না কেন তার জন্য আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করা । কারণ, শুকরিয়ার ফলে বান্দার নেয়ামত আরও বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ বলেছেন যদি কোন বান্দা শুকরিয়া আদায় করে, তবে তার সম্পদ তিনি আরও বাড়িয়ে দিবেন। আর যদি বান্দা অকৃতজ্ঞ হয়, তবে তার জন্য তাকে কঠিন আযাব ভোগ করতে হবে।
[সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ০৭]
১২. সর্বদা সৎ পথ অবলম্বন করা
সৎ পথ বলতে হালাল উপার্জনকে বোঝানো হয়েছে। কোন ব্যক্তি যদি হালাল উপার্জন করে তার উপর আল্লাহ তালার রহমত বর্ষিত হয় এবং তার রিজিক বৃদ্ধি পায়। আর অন্যদিকে হারাম উপার্জনের ফলে আল্লাহ সব ধরনের রহমত বরকত ছিনিয়ে নেন।
১৩. গুনাহ ত্যাগ করা, এবং নেকির কাজ করা
গুনাহ পরিহার এবং নেকির কাজ করার মাধ্যমে রিজিকের প্রশস্ত করা যায়। নেকির কাজ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে। আর যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারলো, তার জন্য এর থেকে বড় পুরষ্কার আর কি হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা তখন তার সকল অভাব দূর করে দেন এবং মানসিক প্রশান্তি দান করেন।
এই ছিল কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আয় বৃদ্ধি করার কৌশল। আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে, যেকোনো কাজ শুরু করে দিলে ইনশা আল্লাহ রিযিক নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।